শারীরিক সুস্থতাঃ হজমশক্তি বাড়ানোর ৫টি উপায়

হজমশক্তিকে কি আমরা শক্তিশালি করতে পারি ? শরীরে অক্সিজেনের প্রয়োজন কেন ? হজমশক্তি বাড়ানোর উপকারীতা কি ? হজমশক্তি বাড়ানোর ৫টি উপায়।


হজমশক্তি বাড়ানোর ৫টি উপায়


এ প্রশ্নের উত্তরে গবেষকরা নানা রকমের মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ এক জটিল প্রক্রিয়া বলেছেন এবং আবার কেউ কেউ বা মনে করেন হজমশক্তিকে বাড়ানোর প্রকিয়াটা মোটামুটি জটিল একটি প্রক্রিয়া। কারণ হিসেবে তারা মনে করেন সব মানুষের হজমশক্তি এক ধরনের হয় না। দেখা যাচ্ছে যে, একই খাবার একজন খেয়ে ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী হচ্ছে আবার একই ধরনের খাদ্য আরেকজন খেয়ে তেমন কোন ভালো ফলাফল পাচ্ছেন না।

একই ধরনের খাবার অনেকেই হজম করতে পারেন আবার অনেকেই হজম করতে পারেন না। হজম শক্তি কিভাবে বাড়ানো যায় বা হজমশক্তিকে কিভাবে বাড়াতে পারি সেটা জানার আগে আমাদের মনে প্রশ্ন আসবে আসলে কি এই হজম শক্তি ? আর কেনই বা বাড়াতে হবে এই হজমশক্তি ? অর্থ্যৎ কেন আমাদের হজমশক্তি বাড়াতে হবে আর এটি বাড়ানোর গুরুত্বটা আসলে কি ? কেনই বা ডাক্তাররা হজমশক্তি বাড়ানোর বিষয়ে বলে থাকেন ? 

হজমশক্তি গুরুত্বপূর্ণ কেন ? 

স্বাস্থ্য বিষয়ে বর্তমানে অনেক মানুষের অনেক মতামত থাকলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্বাস্থ্যের জন্য হজমশক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি যদি কোন কারণে বাধাগ্রস্থ হয় তাহলে দেখা দিতে পারে নানা রকমের সমস্যা। আর হজম শক্তির কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে একজন গবেষক বলেন কোন কারণে যদি হজমশক্তির সমস্যা হয় বা বাধাগ্রস্থ হয় তাহলে পুরো দেহটাই স্থবির হয়ে পড়তে পারে। 

এ বিষয়ে পুষ্টিবীদ সৈয়দ শারমীন আক্তার (প্রধান পুষ্টিবিদ, ডায়েট কাউন্সিলিং সেন্টার) বলেন, “শোষণ ক্ষমতা সম্পূন্ন না হলে তা পুরো দেহকেই প্রভাবিত করে।” 

আর এর কারণেই আমাদের দেখা দিতে পারে না রকমের সমস্যা। এমনকি ওজন হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার মত সমস্যারও কারণ হিসেবে হজমশক্তিকে দায়ী করা হয়। আবার অনেকেরই স্বাস্থ্যহীন বা রোগা হয়ে যায় যেটা অনেক সময় হজমশক্তির কারণে হয়ে থাকে। এর কারণ অনেকের আবার রক্তে গ্লুকোজের পরিমানও বেড়ে যেতে পারে। এছাড়াও আরও নানা রকমের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

এ বিষয়ে ডাক্তার চৌধুরী তাসনিম হাসিন (প্রধান পুষ্টিবিদ, ইউনাইটেড হাসপাতাল লি.) বলেন, “হজম প্রক্রিয়ার তিনটি ধাপ থাকে এগুলো হচ্ছে, খাবার খাওয়া, সেটা পরিপূর্ণভাবে হজম হওয়া এবং হজমের পর সেটা দেহে শোষণ হওয়া। এই তিনটি ধাপই দেহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।” 

তিনি আরো বলেন, গ্যাসের সমস্যা হওয়া, ডায়েরিয়া, কোষ্টকাঠিন্যকেই হজম শক্তির সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। এছাড়াও আরও নানা রকমের সমস্যা হতে পারে হজমের সমস্যা হওয়ার কারণে। বরং হজম প্রক্রিয়া বাধ্যগ্রস্থ হওয়ার কারণে ওজন বৃদ্ধি, দেহের স্থলতা বৃদ্ধির মত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও অনেকেই দেখা যায় যে, অনেক পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছে কিন্তু শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি পাচ্ছে না। এটাও হজম শক্তির সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

একেক মানুষের মেটাবলিজিম বা হজমশক্তি একেক রকমের হয়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় যে, একই রকম খাবার খাওয়ার কারণে কারো স্বাস্থ্য ভালো হচ্ছে আবার দেখা যায় যে, কারো স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে। অনেকেই ডাক্তারদের কাছে এসে এই অভিযোগটা দিয়ে থাকেন অনেক বেশি পরিমাণে যে, “ডাক্তার সাহেব একই খাবার খাওয়ানো হচ্ছে কিন্তু একজনের স্বাস্থ্য ভালো হচ্ছে আর আরেকজনের স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে এর আসল কারণ কি” আসলে এসব সমস্যার আসল কারণ হিসেবে এই হজমশক্তিকেই বিবেচনা করা হয়। সাধারণত যারা হোস্টেলে থাকেন তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যাটা বেশি হয়ে থাকে সাধারণত। 

আজকের আর্টিকেলের আমরা এমন পাঁচটি উপায় সম্পর্কে জানবো যেগুলোর মাধ্যমে আমরা আমাদের হজমশক্তিকে বাড়াতে পারি। 

(১) পর্যবেক্ষণ করা নিয়মিত

কোন খাবারটি খেলে আপনার সমস্যা হচ্ছে সেটি খেয়াল করুণ আগে। এ বিষয়ে ডাক্তার চৌধুরী তাসনিম হাসিন (প্রধান পুষ্টিবিদ, ইউনাইটেড হাসপাতাল লি.) আরও বলেন, “আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ বোঝেই না যে , কোন খাবার তাদের সমস্যা হচ্ছে আর কোন খাবার সমস্যা হচ্ছে না। এই না বোঝার কারণে দেখা যায় যে, অনেক সময় তারা খাবারের লিস্ট থেকে সব ধরনের খাবারই বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। যেমন, তেলে ভাজা খাবার দুধ বা দুগ্ধজাতীয় খাবার, টক খাবার ইত্যাদি।” 

অনেকেরই দুধ খেলে সমস্যা হয় দেখা যায় যে, দুধ খাওয়ার পরপরই তাদের শারীরিক নানা রকমের সস্যা তৈরি হচ্ছে। সেক্ষেত্রে তাকের দুধের তৈরি এমন কোন খাবার খেতে দিতে হবে যেখানে সে দুধের পুষ্টিগুন পায় এক্ষেত্রে আমাদের দেশের বেশিভাগ মানুষই দুধের তৈরি সকল খাবারই পরিহার করে থাকে। এক্ষেত্রে অনেক সময় আমাদের শরীরে দুধের পুষ্টিগুণের অভাব হয়। এরকম আরও কিছু খাবার আছে যেগুলো আমাদের হজমশক্তিকে ভালো করে আর অনেক সময় তার একটা খাবার সমস্যা হওয়ার কারণে সেই জিনিসটা যুক্ত সকল খাবারই খাবারের লিস্ট থেকে সরিয়ে ফেলি যেটার কারণে অনেক সময় আমাদের হজমশক্তিতে বাধাগ্রস্থ হয়ে থাকে আর এই বিষয়টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। 

অনেক সময় দুধ হজম করার জন্য শরীরে ল্যাকটেজ নাম এক ধরনের এনজাইম থাকে। যা দুধ হজম করার জন্য অনেকাংশ দায়ী বা দুধ হজম করার কাজ করে থাকে। আর এই এনজাইম কোন কারণে শরীরে নিঃসরণ হওয়ার যদি বন্ধও হয়ে যায় তাহলে তা আবারও নিঃসরণ হওয়ানো সম্ভব তাই ‍দুধ খেলে সমস্যা হলেই দুধ খাওয়া বাদ দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। আর এজন্যই কোন খাবারে সমস্যা হচ্ছে বা কোন খাবারের কারণে হজমপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হচ্ছে সেটা জানা অনেক জরুরী। 

এছাড়াও অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিন এর অভাবেও হজমশক্তি দুর্বল হয়ে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিলে তা শক্তিশালী করা সম্ভব। 

(২) শারীরিক ব্যায়াম করা 

সব ধরনের শারীরিক ব্যায়াম হজমশক্তিকে বাড়ায় না বলেও মনে করেন পুষ্টিবিদরা। আমরা অনেক সময় না জেনেই বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম করার মাধ্যমে হজমশক্তিকে বাড়ানোর চেষ্টা করি যেটা অনেক সময় আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। হজমশক্তির সাথে যুক্ত অঙ্গগুলো মানুষের কোমরের দিকটাতে অর্থ্যৎ ডায়াফার্ম থেকে নিচ পর্যন্ত থাকে বলে জানান পুষ্টিবিদরা। আর তাদের মতে যেসব ব্যায়ামে শরীরের মাঝের অংশের কর্মকান্ড যত ভালো হবে হজম প্রক্রিয়া তত সুন্দর হবে বলে মনে করা হয়। 

যেমন আমরা অনেক সময় বেশি চেয়ারে বসে থাকি। আর এই চেয়ার যদি নড়াচড়া করে এমন চেয়ার হয় তবে আমাদের শরীরের নড়াচড়া করা অনেকটা সহজ হয়। আবার বসার ক্ষেত্রে যদি শরীরের উপরের অংশ একদিকে আর নিচের দিকের অংশ আরেকদিকে থাকে মানে একটু হেলানো ধরনের সেক্ষেত্রে হজমশক্তি অনেক ভালো হয় বলে মনে করেন পুষ্টিবিদরা। এছাড়াও বিশেষ ধরনের কিছু ব্যায়াম আছে যেগুলো হজমশক্তিকে বাড়ানোর কাজ করে থাকে। যেমন শুয়ে ৯০ ডিগ্রি এ্যাঙ্গেলে দুই পা উঁচু করে রাখতে হবে এবং পা দুইটা চক্রাকারে অর্থ্যৎ ডান থেকে বাম দিকে এবং বাম থেকে ডানে ঘোরাতে হবে। এটা অনেক ভালো কাজ করে বলেও মনে করেন ডাক্তার বা পুষ্টিবিদরা হজমশক্তি বাড়ানোর জন্য। 

অনেক সময় একই জায়গায় দাড়িয়ে বেশ কিছু সময় হালকা করে লাফানো যায় বা জগিং এর মত কাজ যদি একই জায়গায় দাড়িয়ে করা হয় তবে এই ধরনর ব্যায়ামও অনেক উপকারী বলেও মনে করেন পুষ্টিবিদরা। 

(৩) খাবার 

হজমশক্তি বাড়ানোর জন্য খাবারের সঠিক নিয়মটা বুজতে হবে যেমন যদি শাক জাতীয় খাবার হয় তবে অবশ্যই সেটি তেল দিয়ে রান্না করতে হবে আবার গোস্ত জাতীয় খাবার হলে যেন তাতে লেবু থাকে সে বিষয়টা খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিবার খাবার শেষ করে অল্প পরিমাণে লেবুর পাণি খেলে সেটি খাবার হজম করার জন্য অনেক ভালো কাজ করে বলেও মনে করা হয়। খাবার খাওয়া ‍শুরু করার আগে জিহ্বাতে অল্প একটু লবণ স্পর্শ করিয়ে খাবার খেলে, সেটিও অনেক সময় হজমে ভালো উপকার দিয়ে থাকে বা হজমশক্তি বাড়ানোর কাজ ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়াও যেসব ব্যাকটেরিয়া হজমশক্তিকে বাড়ানোর কাজ করে থাকে সেগুলো বেশ খাওয়া যেতে পারে। 

ব্যাকটেরিয়া জাতীয় খাবার আমাদের শরীরের হজমশক্তি বাড়ানোর কাজ করে থাকে। আর ডাক্তাররা বলেন যে, প্রাকৃতিক ভাবে ব্যাকটেরিয়ার সবচেয়ে ভালো উপাদান হচ্ছে দই। ডাক্তার চৌধুরী তাসনিম হাসিন (প্রধান পুষ্টিবিদ, ইউনাইটেড হাসপাতাল লি.) বলেন, “যাদের হজমে সমস্যা হয় তাদের জন্য ইয়োগটি থেরাপি বা দই খাওয়াটা উপকারী হতে পারে। দিনের কোন একটা সময় দেড়শ থেকে দুইশ এমএল দুই খাওয়া যেতে পারে হজমশক্তিকে বাড়ানোর জন্য।” 

(৪) পর্যাপ্ত ঘুম 

রাত জেগে থাকা হজমের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে জানান পুষ্টিবিদরা। পুষ্টিবিদ সৈয়দা শারমিন আক্তার বলেন, “রাতের পরিবেশে এমনিতেই অক্সিজেন কম থাকে। সেই সাথে রাতের বেলায় শরীরের ফুসফুসের বেশিভাগ অংশই কাজ করে না। অর্থ্যৎ ফুসফুসের সকল অংশ রাতের বেলায় কাজ করে না বিধায় শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। আর জেগে থাকলে শরীরের সকল ইন্দ্রিয় কাজ করে আর শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণটাও অনেক বেশি প্রয়োজন হয়। এ কারণেই হজম শক্তিকে বাড়ানোর জন্য রাতে ঘুমানোটা অনেক জরুরী হিসেবে মনে করা হয়। 

কারণ রাতে যদি নির্দিষ্ট সময় না ঘুমানো হয় তবে আমাদের শরীরের পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাব বোধ করে আর এই কারণ অনেক সময় হজমে তা বাধাগ্রস্থ করে থাকে। 

(৫) শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা 

পুষ্টিবীদ সৈয়দ শারমীন আক্তার (প্রধান পুষ্টিবিদ, ডায়েট কাউন্সিলিং সেন্টার) বলেন, “শারীরিক বিভিন্ন ক্রিয়া কতটা ভালোভাবে কাজ করবে তা অনেকটাই নির্ভর করে যে শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেনের সরবরাহ আছে কিনা।” 

আর হজম বা শোষণ প্রক্রিয়ারটা ঠিক রাখার জন্য অক্সিজেনের কোন বিকল্প নেই। আর সে কারণেই শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করাটা অনেকটা জরুরী। তিনি মনে করেন নাক দিয়ে লম্বা করে শ্বাস নিলে আর মুখ দিয়ে লম্বা করে শ্বাস ছাড়লে শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণটা বাড়ে। যার ফলে হজমশক্তি বাড়ানোর অনেকটাই সম্ভব হয় বা সহজ হয়। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যায়াম করার প্রতিষ্ঠান এই ব্যায়ামটা করার বিষয়ে বলে থাকেন আর এটি সকালের দিকে এবং ঘুমানোর আগে করার কথা বলে থাকন। যদিও এই ব্যায়াম করার জন্য অনেক কম সময় লাগে তারপরেও এটি অনেক উপকারী বলেও মনে করেন অনেকেই। 


অনেক ধন্যবাদ মূল্যবান সময় নিয়ে আর্টিকেলটি পড়ার জন্য। আপনার মূল্যবান মন্তব্য কমেন্ট এর মাধ্যমে জানাবেন আশা করি।

Leave a Comment