ডিভোর্সের সংখ্যা দিনদিন কেন এত বাড়ছে। প্রতি ঘন্টায় ভাংগছে সংসার, ডিভোর্সে এগিয়ে নারীরা

প্রতি ঘন্টায় ভাংগছে সংসার, ডিভোর্সে এগিযে নারীরাই বেশি। আমাদের দেশে বিয়ের প্রচলন আগের মত না থাকলেও অনেক বাড়ছে বিয়ে ছাড়া সম্পর্ক। আর্টিকেলটি শুরু করার আগে বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদ কেন বাড়ছে ? এমন প্রশ্নের উত্তরে গুগল অনেকগুলো করণ উল্লেখ করেছি যা সত্যিই অবাক করার মতই।

ডিভোর্সে সংখ্যা দিনদিন কেন এত বাড়ছে।


একটা জরিপ তুরে ধরতে চায় যা আমাদের ঢাকার চিত্র্ পুরুষ ৩০% এবং নারী ৭০% ডিভোর্স দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এলাকায় এই জরিপটা চালানো হয় ২০০৬ থেকে ২০০৯ সালে যেখানে ২৩০৯ টি ডিভোর্স হয়। যার মধ্যে ১৬৯২ টি নারী বা স্ত্রী কর্তৃক আর স্বামী কর্তৃ মাত্র ৯২৫ টি। ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই সংখ্যাটা হয় ৩৫৮৯ টি। যার মদ্যে ২৩৮১ টি স্ত্রী এবং ১২০৮ টি স্বামী কর্তৃক দেওয়া হয়। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই বল হয়েছে ডির্ভোসের ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে।

ঢাকায় ঘন্টায় এক তালাক হচ্ছে এবং ইদানিং এই সংখ্যাটা উর্ধ্বগতিতে। আর এই ডিভোর্স বা তালাকের অন্যতম কারণ হিসেবে একজন গবেষক উল্লেখ করেছেন স্বাবলম্বী নারীদের মেনে নিতে না চাওয়া, যৌতুক ও স্বামীদের মাদকাসক্তি কেই দায়ী করেছেন। আমি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত একটা জরিপ যদি দেখা তবে বিষয়টা অনেক স্পষ্ট হবে।

গত ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পরিসংখ্যান

২০১২ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ২,৮৮৪ টি
২০১৩ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ৩,২৩৮৪ টি
২০১৪ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ৪,৪৪৫ টি
২০১৫ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ৪,০৭৭ টি
২০১৬ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ৪,৮৪৭ টি
২০১৭ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ৫,০৪৬ টি

গত ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পরিসংখ্যান

২০১২ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ৪,৫১৮ টি
২০১৩ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ৪,৪৭০ টি
২০১৪ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ৪,৬০০ টি
২০১৫ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ৪,৭৬১ টি
২০১৬ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ৪,৮৯৭ টি
২০১৭ সালে ডিভোর্স এর আবেদন = ৫,২৪৫ টি

সূত্র বিবিএস ও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশান। এই জরিপে আরও দেখানো হয়। সারা দেশেই বাড়ছে তালাকের বা ডিভোর্সের হার। যার শতকরা ৩৪% বেড়েছে প্রতি বছরে। সবচেয়ে তালাক বা ডিভোর্স হয়েছে বরিশালে যা প্রতি হাজারে ২.৭ জন। এবং সবচেয়ে কম চট্টগ্রাম ও সিলেটে যা প্রতি হাজারে ০.৬ জন। এবং শিক্ষিত স্বামী ও স্ত্রীদের মধ্যে তারাক বা ডিভোর্স বেশি হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।

প্রফেসর ড. মেহজাবিন হক (মনোবিজ্ঞানী) তিনি বলেছেন, “বিয়ে ছোট একটা শব্দ কিন্তু এর অর্থ টা অনেক বড়। এর দায়িত্ববোধটাও অনেক বেশি। এখানে দুইজন ব্যক্তি যারা এক সাথে থাকার একটা সামাজিক বৈধতা পায়। এই দুইজন ব্যক্তির আগে কখনও দেখা বা এভাবে জীবন-যাপন করা হয় নাই। আর বিয়ে নামক শব্দটাই এদেরকে এক সাথে করার অনুমতি প্রদান করে। বিয়ের মাধ্যমেই বিয়ের পরবর্তী বাকি জীবনটা একসাথে থাকার একটা চুক্তি বা সামাজিক বৈধতা আসে। যারা একসাথে থাকবে তারা একটা পরিবার গঠন করবে। তারা পরস্পর পরস্পরের কিছু চাহিদা পূরন করবে। মানসিক ও শারীরিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে তারা একটা পরিবার গঠন করে নিজেদের জীবনটা সুন্দর কারে কাটানোর অন্যতম একটা মাধ্যম হিসেবেই ধরা হয় এই বিয়ে নামক সম্পর্কটাকে। বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে প্রত্যেকটা মানুষ তার নিজের পরিবার ও নিজের বংশ পৃথিবীতে রেখে যেতে পারে।”

মাওলানা লুৎফর রহমান (সভাপতি, ইমাম সমিতি) তিনি বলেন, “প্রত্যেক নর-নারী যাদের বয়স হয়েছে, যাদের শারিরীক ও মানসিক সুস্থতা রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেক জরুরী একটা বিষয় হলো এই বিয়ে।”

বিবাহ বিচ্ছেদ ও ডিভোর্স নিয়ে দুই সন্তানের জননীর সাথে কথা বললে তিনি জানান, “আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচল ছিলাম যেটা আমার স্বামী পছন্দ করতো না। আবার আমার শাশুড়ি যেই কাজটা পছন্দ করতো না সেটা বিয়ের পর এত দ্রুত পরবর্তন করা আমার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠে। নতুন জায়গা একটা মানসিক চাপের পাশাপাশি নানা রকমের প্রেসার যা অনেক সময় ডিভোর্স নামক বিষয়টার জন্ম দেয় অনেক সময়। তিনি মাস্টারস পাশ করার আগেই চাকরীতে ঢুকেছিলেন। আর পড়াশোনা শেষ করে তার বয়সটা বেশি হয়ে যাওয়ার কারণে তিনি আর পাত্রের এত বেশি খোজ নেন নাই যতটা নেওয়া উচিত ছিল। তারপর ছেলে বিদেশে পড়াশোনার জন্য যায় কিছুদিন পরে তার বাচ্চাসহ পরিবারকেও নিয়ে যায়। সেখান থেকেই মুলত শুরু তারপর দেশে এসে আইনের মাধ্যমে সন্তানদের নিজের কাছে রাখার একটা ব্যবস্থা করতে পারলেও হারিয়েছেন নিজের স্বামীকে। ”

এটা তো বললাম একজন উচ্চ পরিবারের কথা। এবার একজন নিম্ন পরিবারের একজন নারী জানান তার জীবনের কথা। তিনি জানান তাদের পরিবার ভালোই চলছিল হঠাৎ করেই তাদের পরিবারে সমস্যা দেখা দেয়। তার শাশুড়ি তাকে চাকরি করতে বলে এবং এর পরেই শুরু হয় সমস্যা। তিনি তার সমস্যা বলতে গিয়ে পারিবারিক কারণটাই বললেন। আসলে এমন সমস্যা আমাদের দেশে অনেক বাড়তেছে দিনদিন। অর্থনৈতিক সমস্যাটাও অনেক বড় একটা কারণ। আমি উপরে যেই জরিপটা দেখিয়েছি সেটা শুধু উচ্চবিত্তদের যাদের ডিভোর্স হয় আদালতের মাধ্যমে কিন্তু এর বাইরেও আরও অনেক ডিভোর্স যারা নিম্ন বিত্ত তাদের হয় যা আমাদের জরিপের বাইরে।

ঢাকায় ঘন্টায় একটা তালাক বা প্রতি ৫০ মিনিটে হয় একটা তালাক এমন কথাও শোনা যায় জরিপে। এ থেকে প্রথম আলো ৯ জানুয়ারী ২০২১ এ ঢাকায় দিনে ৩৯ তালাক নিয়ে একটা প্রতিবেদন করেছে। অর্থ্যৎ প্রতি ৩৭ মিনিটে হচ্ছে একটা করে তালাক। একজন সমাজ বিজ্ঞানি মনে করেন করোনার কারণে দারিদ্রতা বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে পারিবারিক কলহ যার ফলেই হচ্ছে এই তালাক। তালাকের কারণ খুজতে গিয়ে ২০১৯ সালের জুন মাসে বিবিএস একটা প্রতিবেদনে বলে, পারিবারিক দারিদ্রতা, লোভ, পরকিয়া এসব কারণেই মূলত হচ্ছে বিবাহ বিচ্ছেদ। তবে বিবিএস মনে করে যে, আমাদের দেশে প্রতি বছর তালাকের পরিমানটা অনেক বেশি বাড়ছে যার অনেক বড় একটা অংশ হলো শিক্ষিত সমাজ এবং মেয়েদের কর্মসংস্থানই মেয়েদেরকে পারিবারিক চাপ থেকে বের করে আনার একমাত্র উপায় হিসেবে তালাকটাকে ভালো করছে।

অনেক মেয়েই দেখা যাচ্ছে যে, নিজেরাই উপার্জন করতে পারে আর তারা নিজেদের উপার্জনের কারণে নির্ভরশীলতা থাকে না। এবং স্বামী কোন কারণে আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ বা মাদকাসক্ত হলে তখন সেই নারী আর তার পরিবারকে টিকিয়ে নিতে চায় না। বিকল্প ব্যবস্থা থাকার কারণে তালাককেই সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে মনে করছেন অনেক নারীই। কেন বাড়ছে এই তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ এমন প্রশ্নে একজন সমাজ কর্মী বলেন, বর্তমানে স্বামী স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হওয়ার কারণেই তারা নিজেরাই বেছে নিচ্ছে এই বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক। ঢাকায় তালাকে এগিয়ে নারীরা এমনটা মনে করা হলেও পুরুষের পক্ষ থেকেও কম নয় বর্তমানে এর পরিমাণটা। অনেকেই আবার মনে করছেন বিবাহ-বিচ্ছেদ বা তালাক যদি নারীরা দেয় তবে আইনি জটিলতায় পড়ার সম্ভবনা কম তাই অনেক সময় নারীরাই দিচ্ছে বেশি।

একটা সময় ছিল যখন নারীর ক্ষমতায়ন ছিল না আর নারীরা বাধ্য হয়েই পরিবার করতো। আর নিজেরা বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি ছাড়া আর কোন জায়গা পেতো না। কিন্তু বর্তমানে নারীরা কর্মজীবি হওয়ার কারণে তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন ধারণ করতে পারে। এটাও অনেক বড় একটা কারণ বিবাহ-বিচ্ছেদে নারীরা এগিয়ে থাকার। কারণ আগে একটা সময় যখন পারিবার ও মানসিক চাপ বেড়ে যেতো নারীরা যেহেতু কর্ম করে না তারা তখন অসহায় আর যার কারণে তারা চাইলেও এর অশান্তি থেকে বের হয়ে আসতে চাইতো না। যেটা বর্তমানে নারীদের কর্মসংস্থানের কারণে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে।

আমি আর্টিকেলটিতে একটা জরিপ তুলে ধরার চেষ্টা করেছি আমি কোন সমাধান বা নির্দিষ্ট কারণ এখানে তুলে ধরি নাই। তবে হ্যা আমাদের পরিবার প্রথা যে ভেঙ্গে যাচ্ছে তা এই জরিপ দেখলেই বোঝা যায়। আশা করি আর্টিকেলটিতে আপনি বেশ কিছু তথ্য পেয়েছেন বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পর্কে আর কেন বাড়তেছে দিনদিন এই বিবাহ বিচ্ছেদ। আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানাবেন কমেন্ট এর মাধ্যমে।

Leave a Comment