করোনার সময়ে শিশুদের লেখাপড়ার মধ্যে রাখার ৫টি উপায় জানিয়েছে ইউনিসেফ

কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে বাড়িতে শিশুদের কিভাবে লেখাপড়া করাবেন তা সম্পর্কে ৫টি পরামর্শ বা উপায় জানিয়ে ইউনিসেফ কতৃপক্ষ। শিশুদেরকে বাড়িতে লেখাপড়ার মধ্যে রাখতে দিয়েছেন ইউনিসেফ এর শিক্ষা কার্যক্রমের বৈশ্বিক প্রধান। 

covid 19 education

করোনার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কোন সেক্টর যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয় তবে আপনি হয়তো অনেক সেক্টরের নামই জানাতে পারবেন। কারণ করোনা মহামারির সময়ে ক্ষতির সামনে পড়ে নাই এরকম কোন সেক্টর নেই। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ সেক্টর হলো শিক্ষা সেক্টর। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে শিশুরা। 

করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) এর সময়ে সারাবিশ্বে পারিবারিক জীবন লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে। নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল ও সামাজিক জীবন-যাপন করা, শিশুদেরকে বাড়িতে আবদ্ধ করে রাখা, স্কুল বন্ধ, বাড়িতে বসেই অফিসের কাজ করা, নিয়মিত ডাক্তারের সাথে অনলাইনে যোগাযোগ রাখাসহ নানারকম কার্যক্রম চলছে এই করোনা বা কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে। এসব দিক বিবেচনা করে ইউনিসেফের গ্লোবাল চিফ অব এডুকেশন রবার্ট জেনকিন্স বাড়িতে থাকা শিশুদেরকে নিয়ে সুন্দর পরামর্শ  দিয়েছে যা আমাদের সবারই মেনে চলা উচিত বলে তিনি মনে করেন। 

নিচে ইউনিসেফ কর্তৃক ৫টি পরামর্শ আলোচনা করা হলো

(ক) পড়াশোনার সময়সূচি আলোচনার মাধ্যমে পরিকল্পনা করা 

বিভিন্ন দেশ এর মধ্যেই অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করছে। অনলাইনের মাধ্যমে, টেলিভিশান ও রেডিওর মাধ্যমে, গুগল একাউন্ট বা জুম ক্লাসের মাধ্যমে যেসব প্রতিষ্ঠান বা যেসকল দেশ তাদের পড়াশোনা চালু রাখার চেষ্টা করতেছে তার জন্য সুন্দর একটা রুটিন তৈরি করা প্রয়োজন। স্কুলে যেমন শিশুরা একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে যেতো বা পড়াশোনার কাজ পরিচালনা করতো সেরকমই হবে রুটিনটা। তবে এটা অবশ্যই দেশভেদে আলাদা আলাদা হতে পারে যেটা আপনারা নিজেদের সুবিধা ও শিশুদের সুবিধামত করার চেষ্টা করবেন। শিশুদের প্রতি বেশেষ করে নজর দিতে হবে। তাদের পড়াশোনা ও খেলাধূলার জন্য প্রত্যেক মা-বাবার আলাদা করে সময় বরাদ্ধ করে রাখতে হবে। দৈনিক কাজগুলোর মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় সংযুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে বা করার চেষ্টা করতে হবে। যদি সম্ভব হয় এসব বিষয়ের জন্য শিশুদের সাথে কথা বলে পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলতে হবে। হতে পারে সেটা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে বা মাসিক যা শিশুদের সাথে কথা বলেই করার চেষ্টা করতে হবে। 

করোনার সময়ে শিশুদের লেখাপড়ার মধ্যে রাখার ৫টি উপায় জানিয়েছে ইউনিসেফ


শিশু ও কিশোর বয়সীদের পক্ষে নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলার সত্যিই অনেক কঠিণ একটা কাজ। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে হবে এবং নিয়মিত তাদেরকে সারাবিশ্বের পরিস্থিতি আপডেট রাখতে হবে। কারণ ছোট বয়সেই যদি আপনি তাদের মতামতের মূল্যয়ন করেন বা তাদের কথা শোনেন তবে তাদের ভেতরে আলাদা একটা দায়িত্ববোধ তৈরি হবে। আমরা আসলে আমাদের নিজেদেরকে অনেক বেশি মূল্যয়ন করুক এই বিষয়টা ছোট বয়স থেকেই চায়। 

(খ) খোলামেলা শিশুদের সাথে আলোচনা করুন 

বর্তমান সময়ে শিশুদেরকে সময় দেওয়ার কোন বিকল্প নেই। কমলমতি শিশুরা যখন স্কুলে যেতো তখন তারা তাদের মনে ভাব বন্ধুদের কাছে প্রকাশ করতো। আর খেলাধূলা ও দৌড়াদৌড়িতে তাদের মানসিক অনেকাংশ কমে যেতো । যেহেতু করোনা মহামারির সময়টাতে এটা সম্ভব হচ্ছে না তাই বাড়িতেই তাদেরকে যতটুকু সম্ভব সময় দেওয়ার চেষ্টা করুন। দিনের কিছু অংশ পড়াশোনা করানো, তারপর কিছু অংশ খেলাধূলার কাজে ব্যয় করা, কিছু অংশ তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করুন। আমরা অনেক সময় শিশুদেরকে নিজের কাজ নিজে করার জন্য কোন চেষ্টাই করি না। যেমন, আপনি তাকে তার পোশাকটা জায়গামত রাখার কথা বলতে পারেন আবার নিজের জোতাটাও তার জায়গামত রেখে দিবে এসব বিষয় বলে তার অভ্যাস তৈরি করে দিতে পারেন। 

আসলে তারা নিজেরা যখন খেতে চায় বা হাত দেয় তখন আমরা তাদের হাতটাকে সরিয়ে নিজেদের হাত দিয়ে খাওয়ানোর কাজটা অনেক সহজেই করে ফেলি। অনেক সময় এমনও দেখা যায় তাদের দুই হাত একজন ধরে রেখেছে এতে করে তারা নিজেদেরকে হীনমোন্যতায় ফেলে দেয় সেই বয়স থেকেই। তারা মনে করে তারা কোন কাজ করতে পারে না আর যার কারণে প্রয়োজন অনেক সময় আপনি যখন তাদেরকে খাওয়ানোর সময় পান না বা অসুস্থ থাকেন তখন তারা সেই অভ্যাসের কারণেই খেতে চায় না। আর এসব ছোট ছোট অনেক বিষয় আছে যেগুলো আপনি ছোট বয়স থেকেই ইচ্ছে করলে ভালো অভ্যাসে পরিণত করে ফেলতে পারেন নিমিশেই। তাদের সাথে এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বা আলোচনা করতে হবে। এতে করে তারা নিজেদেরকে দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলবে।  

খোলামেলা শিশুদের সাথে আলোচনা করুন


আমরা আমাদের আশেপাশের শিশুদের সাথে তাদেরকে কিছু সময় খেলাধূলা করাতে পানি নিয়ম করে। যদিও এই সময়টাতে যতটুকু সম্ভব নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলাই উত্তম তারপরেও অনেক সময় আছে কিছু খেলাধূলা যেটা আপনাকে নিশ্চিত করতে পারে নিরাপদ ‍দূরত্ব সেগুলোতে সময় দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে গ্লাবস ও হ্যান্ডস্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারেন। তাদের সাথে খাবার নিয়েই আলোচনা করতে পারেন কোনটা খেতে চাইছে এসব বিষয়।  


(গ) প্রয়োজনীয় সময় ও কাজ জেনে নিন

শিশুদের সাথে হতে হবে অনেক ফ্রি। তাদের সাথে করোনা মহামরি চলাকালিন সময়টাতে অনেক বন্ধুসুলভ ্আচরণ করতে হবে। আমরাই পারি তাদের মেধার বিকাশটা ধরে রাখতে। নিয়মিত রুটিন মেনে চলা ও তাদের সাথে সময় দিয়ে আমরা তাদের প্রয়োজনীয় কাজ ও সুবিধা ও অসুবিধাগুলো জেনে নিয়ে তা সমাধান করতে পারি। কোন বিষয় তাদের জন্য ভালো না হলে কোনটা ভালো হবে সেটা জেনে তাদেরকে সেইভাবে সেই বিষয়টা দিয়েও আমরা সহযোগীতা করতে পারি। কিছুদিন আগে আত্মজার্তিক একটা সংস্থা আমাদের দেশের মেয়ে শিশুদের নিয়ে একটা জরিপ করেছেন। সেখানে তারা বলেছে আমাদের দেশের প্রায় অনেক মেয়ে শিশুই ছোট বয়সেই শারিরী নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। 

এর অবশ্য অনেকগুলো কারণ আছে। কারণ আমরা মেয়ে শিশুদেরকে এখন সামাজিকভাবে ছেলে শিশুদের মত মূল্যায়ন করি না। ইউনিসেফ মিনা ও রাজুর কার্টুন দেখানোর ফলে অনেক ভুল ধারণাই পাল্টে গেছে তারপরেও সমস্যা তো আর এক দিনে না তাই যেতেও সময় লাগবে। তাই আমরা যারা মা আছি মেয়ে শিশুদেরকে কাদের কাছে রাখছি কাদের সাথে মিশতে দিচ্ছি সেই বিষয়টা নজর দেওয়ার চেষ্টা করবো। অনেক সময় তারা এমন ব্যাক্তিদের সাথে থাকছে যার ফলে বিভিন্ন ভালো শারিরীক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। 

আরো পড়ুন >> ২০২১ সালের সরকারী ও বেসরকারী ছুটির তালিকা জানুন। 

আরো পড়ুন >> দেশীয় বড় কম্পানিগুলো নামগুলো জেনে নিন এখনই।

প্রয়োজনীয় সময় ও কাজ জেনে নিন


শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য নিরাপদ পরিবেশটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা ইউনিসেফ বরাবরই বলে আসছে। আমরা তাদেরকে উপযুক্ত পরিবেশ দিতে পারলে তারাই এক সময় দেশের সম্পদে পরিণত হবে আশা করা যায়। কারণ আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। 

(ঘ) অনলাইনে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করুন 

শিশুদের সুরক্ষা বলতে তারা যেন  এই সময়টাতে মানসিক ভাবে ও শারীরিকভাবে দূর্বল না হয় সেই দিকটাতে নজর দিতে হবে। অনলাইনে অনেক সময় আমরা আমাদের শিশুদেরকে কোন নিরাপত্তা ছাড়াই ছেড়ে দিয়ে থাকি। অনেক মা বাবাই আছে যারা ইন্টারনেট সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না। আর একটা ডিভাইস কিনে শিশুদের হাতে দিয়েছেন তারা যেন এর মাধ্যমে পড়াশোনা করে। আসলে বিষয়টা তেমন না। কোভিড-১৯ মহামারির সময়টাতে শিশুদেরকে বাড়িতে নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই শিশুদেরকে বাসায় বসে পড়াশোনা করার নির্দেশ দিয়েছে। আর এই কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্লাস করানোর জন্য অভিভাবকদেরকে ডিভাইস দিতে বলেছে। আর আপনার দায়িত্ব হলো তারা ডিভাইস দিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি আর কি কি কাজ করছে। 

তারা যেন অনলাইনে নিরাপদ থাকে সে জন্য আপনাকেই সচেতন হতে হবে। কারণ বর্তমান সময়ে যেহেতু অনলাইন নির্ভর ফলে অনেক অনলাইন সমস্যাই অনলাইনে দেখা দিয়েছে। আপনি হয়তো চারিদিকে একটু লক্ষ্য করলেই বিষয়টা বুঝতে পারবেন।  

অনলাইনে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করুন

করোনা পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থা কেন হবে।

অনলাইনে অনেক সময় নেশায় আশক্ত হতেও দেখা গেছে অনেক শিশুকে। তারা বিভিন্ন ধরনের গেমের মধ্যে আসক্ত হয়ে যায় অনেক সময়। আর এর জন্য আমরা নিজেরাই অনেক সময় দায়ি থাকি। বর্তমানে পর্ণগ্রাফির ব্যাপক ছড়ানো লক্ষ্য করা যাচ্ছে চারিদিকে। আর এর জন্য আপনাকেই সচেতন হতে হবে। আমাদের দেশের অনেক সংস্থাই এ নিয়ে কাজ করছে। যদিও বর্তমান সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনলাইন পর্নগ্রাফি নিয়ে আলোচনা হয় এমন সাইট ব্লক করে দিয়েছে তারপরে নিজেদেরকে সচেতন করতে হবে। মনে রাখতে হবে পর্ণগ্রাফি মানবতার জন্য হুমকি। নেশা শুধু মদ, গাজা, হিরোইন, আফিম এসবেই হয় না অনেক সময় ইন্টারনেটের আসক্তিটাও নেশার অন্যতম কারণ হয়ে যায়। 

(ঙ) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে শিশুকে যুক্ত রাখুন  

শিশুদেরকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত রাখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নির্দেশনা নিয়ে তাদেরকে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করানো এবং তাদেরকে নিয়মিত আপডেট দিয়ে হোম ওয়ার্ক করানো এসব বিষয় একজন অভিভাবকের উচিত ভালোভাবে নজর দেওয়া। করোনা মহামারির কয়েক মাস সমস্যা হলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই খুব দ্রুতই অনলাইন নির্ভর বা অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম চালু করেছে। আর অনলাইনে নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে ‍যুক্ত থেকে তাদেরকে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী করে তোলার জন্য চেষ্টা করতে হবে। 


শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে শিশুকে যুক্ত রাখুন


তাদের নিয়মিত রুটিনে প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করাটাও একটা রুটিনের মধ্যে রাখতে হবে। নিজেরাই যেন নিজেদের পড়াশোনাটা জেনে আপডেট রাখতে পারে এবং নিজেদের পড়াশোনার জন্য যেন নিজেরাই বিশেষ ভুমিকা পালন করতে পারে সেই বিষয়টা আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে। অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত না তারা অবশ্যই যারা যুক্ত আছে তাদের মাধ্যমে যুক্ত থাকার জন্য চেষ্টা করতে হবে। ক্লাস টিচারদের সাথে যোগাযোগ করে পড়াশোনা আপডেট রাখার চেষ্টা করতে হবে। আমরাই পারি করোনা মহামরির সময়টাকে আমাদের শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। অনেক দেশই একন এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে আমাদের মত এত জনসংখ্যার দেশে এমন সমস্যা যদি মহামারির মত দেখা দেয় তবে অনেক বেশি ক্ষতি হতে পারে। 

উপরের ৫টি বিষয় ইউনিসেফের দেওয়া। তবে বর্ননাগুলো নিজেদের মত করে দেওয়া আছে। আপনি ইউনিসেফের লিংক থেকেও এরকমই লিখা পড়তে পারেন তার জন্য Click here এখানে ক্লিক করতে হবে। আসলে কোভিড-১৯ অনেক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে আমাদের জীবন-যাপনে। করোনা মহামরিতে আমরা আমাদের নিজেদের পাশাপাশি আমরা আমাদের শিশুদের সুরক্ষার প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করবো। 

নিচের আর্টিকেলগুলো পড়তে পারেন সময় করে >>

(ক) করোনার সময়ে কেন আপনি একজন ব্যবসায় হবে তার ১০টি কারণ জেনে রাখুন। 

(খ) ২০২১ সালের চাকরীর খবর জানার জন্য পড়তে পারেন। 

(গ) রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার জাদুকরি টিপস। 

(ঘ) ২০২১ সালের জন্য সেসব দক্ষতা অনেক বেশি জরুরী এখনই জানুন। 

Leave a Comment