বর্তমানে কেন সরকারী চাকরীতে এত আগ্রহী যুবসমাজ

সরকারী চাকরি কে না চায় ? সবাই তো চায় পায়ই বা কতজন ? সরকারি চাকরি মাানেই কি জীবনের সব পাওয়া সফল হবে ? সরকারী চাকরির জন্য কেন এত প্রতিযোগীতা ? বর্তমানে কেন সরকারী চাকরীতে এত আগ্রহী যুবসমাজ। এসব নানা প্রশ্ন সব সময়ই আমাদের মনে বাসা বাধে। 


বর্তমানে কেন সরকারী চাকরীতে এত আগ্রহী যুবসমাজ

১০ বছর বা ১৫ বছর আগেও সরকারী চাকরিতে এত বেশি প্রতিযোগী ছিল না। কিন্তু বর্তমানে সরকারী চাকরি মানেই বলা হয় সোনার হরিণ। আসলে এই প্রতিযোগীতা এত হওয়ার কারণটা কি ? আজকের আর্টিকেলটি মূলত এই বিষয়টা নিয়েই। আশা করি আর্টিকেল শেষে আপনার প্রশ্নের উত্তরটা পরিপূর্ণ না পেলে ধারণা পাবেন। 



আইএলও এর তথ্য মনে দেশের মোট জনসংখ্যার ৪.২ শতাংশ বেকার। আবার দেশের মোট শিক্ষিত স্নাতক শ্রেণির মধ্যে ৪৭%  বেকার। তথ্যগুলো হয়তো পুরোটা সঠিক নয় তবে ধারণা দিতে পারবে বেকার বা চাকরির বাজারে কতটা প্রতিযোগীতা আছে সেই বিষয় সম্পর্কে। কারণ কিছু দিন আগের ঘটনা আমাদের দেশের সরকারি প্রাইমারিতে শিক্ষক নিয়োগের আবেদন জমা  পড়ে। আর এখানে প্রায় ১৪ লক্ষ মানে ১৩ লক্ষের বেশি আবেদন জমা পড়ে। এবারের আবেদনের জন্য আলাদা বিষয় ছিল মেয়েদের ও ছেলেদের যোগ্যতা সমান ছিল  যা বিগত বছরগুলোতে ছিল না। যার ফলেও এত আবেদন জমা পড়েছে এই ১৩ লাখের মধ্যে সবাই কিন্তু বেকার বা চাকরি প্রত্যাশী আর সবাই উচ্চশিক্ষিত লোকজন। আসলে এই সংখ্যাটাই যথেষ্ঠ বর্তমানে আমাদের দেশে কতজন বেকার এই সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য। 


এত এত আবেদন আমাদের মনে তো প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক যে, বর্তমানে কেন সরকারী চাকরীতে এত আগ্রহী যুবসমাজ ? এর আসল কারণটা বের করা আগে কিছু  বিষয় জেনে নেওয়াটা অনেক জরুরী। তার মধ্যে অন্যতম কিছু বিষয় হলোঃ 



(ক) লৌকিকতা

লৌকিকতা বলতে আমরা বুঝি যেই কাজটা লোক দেখানোর জন্য করা হয়। যদিও নিজের প্রয়োজন তারপরেও লোক দেখানোর জন্য কোন কাজ করাকেই মূলত লৌকিকতা বলা হয়। আমি সরকারী চাকরি করি তুমি কি চাকরি কর ? বা আমাদের ছেলে বা মেয়ে সরকারী চাকরি করে তোমার ছেলে বা মেয়ে কিসের চাকরি করে ? চাকরি শব্দটা ভালো কিন্তু সাথে যদি সরকারী শব্দটা যোগ করে দেওয়া হয় তখনই যত সমস্যার কারণ হয়ে দাড়ায়। চাকরি করুক এটা কোন বিষয় না তবে সরকারী চাকরি করুক বা করবে এটাই আসল বিষয়। 


চাকরিটা যদি সরকারী হয় তারপরেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। তা হলো কোন পজিশানে করে আর বেতন কত ? যদিও ভদ্র সমাজে বেতন জিজ্ঞেস করাটা অভদ্রতার মতই দেখায় তারপরেও আমরা তো লৌকতায় বিশ্বাসী কাউকে কতটা ছোট করা যায় তার জন্য সর্বোচ্চ্য চেষ্টা করার চেষ্টায় আমরা লিপ্ত থাকি। আর এই চেষ্টার শেষটা অনেকটাই খারাপ হয়ে থাকে। সবাই না বেশির ভাগই লৌকিতার কারণে সরকারী চাকরির জন্য অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে থাকে। আমাদের দেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে শুধু বেতন দিয়ে হয়তো সবার চলে না তারপরেও সে সরকারি চাকরী করতে বা করবে এমন আগ্রহ প্রকাশ করে। আসলে দুর্নীতির অন্যতম একটা বড় কারণ হলো এটা। দেখা যাচ্ছে ২২ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করছে কিন্তু তার চলাচল হচ্ছে এমন যেটাতে মাসিক খরচ ৪০ হাজার টাকার মত। 


লৌকিকতায় জড়িয়ে পড়ার কারণে অনেকেই দুর্নীতিতে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। তারপরেও আরও পরিবেশগত কিছু বিষয় থাকে। আসে পাশের বন্ধু বা লোকজন যখন অনেকেই সরকারী চাকরি পায় বা করে তখন পরিবার বা আশেপাশের পরিবেশ থেকেই চাপ চলে আসে সরকারী চাকরি করার জন্য। 



(খ) প্রতিযোগিতা বিহীন জীবন ব্যবস্থা

আমি বলবো না প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করা মানেই সে ভালো তবে হ্যা জীবনের ্প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রতিযোগীতা থাকাটা জরুরী। কারণ প্রতিযোগীতা থাকলে আমাদের কাজের মানটা অনেক ভালো হয়। আমি বললে বিষয়টা এককেন্দ্রিক হবে অনেকেই মনে করেন সরকারী চাকরী পাওয়া মানেই জীবনের প্রতিযোগীতা করার পালা শেষ। কারণ আপনি একটা সরকারী চাকরী পাওয়া মানেই ভালো বিয়ে করতে পারা, সমাজে ভালো পজিশান পাওয়া, আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে মূল্যায়নের পাত্র হওয়া, সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া ইত্যাদি। কেন বিয়ের প্রসঙ্গটা বললামতার অন্যতম কারণ চাকরি না থাকার কারণে অনেকেই বিয়ে করতে পারছে না এমন সংখ্যাটাও নেহাত কম না। যদিও পারিবার সংক্ষমতা থাকার কারণে অনেকেই করছে তারপরেও করতে না পারার সংখ্যাটা অনেক বেশি। 



কেউ একজন সরকারী চাকরী পেলে সে আর কোন প্রতিযোগীতা করতে চায় না মানে চাকরী করবে তার জীবন পার করবে এটাই শেষ। সরকারী চাকরি করলে কিছু নিয়ম মানতে হয় আর কিছু নিয়মের মধ্যে অন্যতম হলো আপনি যা ইচ্ছা তাই করতেও পারবেন না। এটার কারণে আপনাকে জবাবদীহিতা করা হয় প্রতি বছর আর এই কারণে অনেকেই ধারণা করেন সরকারী চাকরী করা এবং পাওয়ার অন্যতম একটা বড় কারণ হলো প্রতিযোগীতা বিহীন জীবন পার করা। আমি আবারও একটা প্রসঙ্গ আনবো তা হলো বিয়ের বিষয়টা। দেখুন আপনি মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে যদি ৮০ হাজার টাকা বেতনের চাকরিও করেন আর আরেকজন যদি ৩৮ হাজার টাকা বেতনের সরকারী চাকরিও করে তবে আপনার চাইতে সরকারী চাকরি করার ব্যক্তির মূল্যায়নটা বেশি। 


আমার মনে হয় এই বিষয়টা নিয়ে আর না বললেও আপনাদের একটা ধারণা হয়ে গেছে এতক্ষণে কি বোঝানোর জন্য বিষয়টা বললাম সেটা। 




(গ) কোচিং সেন্টার

আমি এই কারণটাকে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করবো বর্তমানে।কারণ সরকারী চাকরির খবরগুলো সাধারণ মানুষের কাছে যিনি পৌছে দেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলো কোচিং সেন্টার। কোচিং সেন্টার নিয়ে আলাদা আর্টিকেল হলে বিষয়টা ভালো বোঝা যাবে হয়তো। যাইহোক আমার কাছে মনে হয় হয়তো কোন একজন তার পড়াশোনা ও যোগ্যতা অনুসারে যথেষ্ট ভালো চাকরী না পাওয়াতে তিনি মনে করেন সমাজের চোখে উপকার হয় এমন কিছু কাজ করবো তিনিই তার অভিজ্ঞতাকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ফেইসবুক বা ইউটিউবে কিছু ফ্রি রিসোর্স দেওয়ার মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন প্রথমে। তারপর ধীরে ধীরে তিনি কোচিং সেন্টার বা বই বিক্রি করার বিজ্ঞাপন দিয়ে দেন। এটা একটা প্রফেশনাল কাজ আপনি আরেকটা কাজের ফাঁকে ফাঁকে করতে পারবেন ঠিকই কিন্তু এর মান তেমন ভালো হবে না। 


এর মান কেমন হয় তার উদাহারণ আপনারা বিভিন্ন ভুল যুক্ত বইতে দেখেছেন অনেকেই। প্রুফ রিডার থাকলেও অনেক সময় অনেক বেশি ভুলযুক্ত বই বাজারে পাওয়া যায় ইদানিং আর এদের প্রচার করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো ফেইসবুক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটাকেও এই শ্রেণির মানুষগুলো বিজনেস করার উপযুক্ত জায়গা হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। আর এদের কারণে যারা প্রফেশনাল বই তৈরির কাজ বা এসব বই নিয়ে কাজ করতো তাদের অবস্থাটা বেহাল। এমনও প্রকাশনি তাদের কর্মী ছাটাই থেকে শুরু করে অনেকেই বন্ধু করে দেওয়ার মত অবস্থাতে পৌঁছেছে। সরকারী চাকরি ছাড়াও দেশের জন্য কাজ করা যায় আর সেটা আরো ভালো হয়। দুর্নীতির লিস্ট দেখতে গেলে দেখা যাবে বেশির ভাগই সরকারী চাকরি করতো এমন ব্যক্তিরা যুক্ত আছেন।কারণ কম্পানির চাকরী করে দুর্নীতি করা যায় না বা গেলেও সেটা বেশি দিন টিকে না। আর সরকারী চাকরি যেহেতু একবার পেলে আর সহজে যায় না সেহেতু এখানে দুর্নীতির করার সুযোগটা অনেকটাই বেশি। 





বি. দ্র. আর্টিকেলটির বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবার আগে দেশ বিষয়টা বুঝতে পারলে আর্টিকেলটির সারাংশ বোঝা সহজ হবে।

Leave a Comment