চাকরি প্রত্যাশাকারী বেকারদের শুক্রবারের রুটিন

শুক্রবার মানেই ছুটির দিন। আর এই দিনে চাকরি করেন যারা তারা বাসায় বসে আরাম ও একটু বিশ্রাম করার সুযোগ পান। কিন্তু চাকরি প্রত্যাশাকারী বেকারদের শুক্রবারের রুটিন টা কেমন হয় কারো ধারণা আছে। হয়তো যারা একটা সময় বেকার ছিলেন তারা বলতে পারবেন কেমন হয় রুটিনটা। আমাদের মধ্যে বেশিরভাগই বেকার আর বর্তমান জরিপ অনুসারে আমাদের দেশে বেকারের সংখ্যাটা অনেক বেশি। 


চাকরি প্রত্যাশাকারী বেকারদের শুক্রবারের রুটিন



প্রতি শুক্রবার যদি আপনি বাইরে যান তবে যাদেরকে একটা ব্যাগ আর কিছু ফাইল হাতে নিয়ে যেতে দেখেন তারাই মূলত বেকার আর তাদের অন্যদিনের চাইতে শুক্রবারের দিনটাতে ব্যস্ত থাকতে হয়। আজব একটা লাইফ যারা চাকরি করেন তারা শুক্রবার ছুটি কাটান আর যারা চাকরি খোজেন তারা শুক্রবারের দিন ব্যস্ত থাকেন চাকরি খোজার জন্য। আসলে কেমন হয় একজন বেকার বা চাকরি প্রত্যাশা করা যুবকের রুটিন আসুন জেনে নেওয়া যাক। আজকের আর্টিকেলে মাধ্যমে আমরা এই বিষয়টাই  জানার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। 



(ক) পরীক্ষার কেন্দ্রের খোজ নিয়ে পরিকল্পনা করা

সবার আগে আমাদের মধ্যে যারা বেকার আর যারা চাকরির জন্য আবেদন করেছেন তারা সবাই কোথায় কোথায় পরীক্ষা হবে এবং সেখানে কিভাবে যেতে হবে সবকিছু আগে থেকেই পরীক্ষা করে রাখেন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যদি বলি তবে এক গ্রামের ভাই ছিল যার পরীক্ষা ছিল মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে গ্রাম থেকে আসার আগে গুগল করে বা বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে সঠিক তথ্য না পাওয়াতে আমাকে যখন জানায় তখন আমি তাকে বললাম যে, “আপনি চাকরি প্রস্তুতি যে কোন গ্রুপে বিষয়টা জানান। আমার মনে হয় যারা বিভিন্ন জায়গায় এর আগে পরীক্ষা দিয়েছে তাদের মধ্যে কেউ না কেউ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এর আগে পরীক্ষা দিয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ যদি জানে তবে অবশ্যই আমাকে কিভাবে আসতে হবে সব বলে দেবে।” 


তারপর তিনি সেখানে যাওয়ার জন্য ট্রেন থেকে নেমে বিমান বন্দর বাসট্রাপিজ থেকে বাসে করে মোহাম্মদ বাসট্রপিজ থেকে একটু সামনে নেমে তারপর ওখান থেকে ৫ টাকা দিয়ে একটা সি. এন. জি. এর মত গাড়ি অথবা ১০ টাকা দিয়ে রিক্সা অথবা পায়ে হেটেও যেতে পারবেন এমন তথ্য সেই পোস্ট এর কমেন্ট থেকে জানতে পারেন।



এটা তো গেলো কেন্দ্র খোজ করার পদ্ধতি। তার আছে পরীক্ষার এডমিন কার্ড বের করে সেটা প্রিন্ট করে সুন্দর করে রাখা। যদি আপনি নতুন হন তবে ফাইল ছোট বেলার মত করে মানে পরীক্ষা দিতে যেভাবে আসতে হয় সেভাবে আসবেন আর যদি আপনি অভিজ্ঞ হন তবে ভাজ করে পকেটে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য পিপারেশান নেবেন। অনেকেই ছোট খামের মধ্যে করে নেয়। যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসেন তারা বেশিভাগই ব্যাগে করে নিয়ে আসেন। তবে ঢাকার মধ্যে যারা থাকেন বা আগের রাতে এসে কোথাও থেকে তারপর পরীক্ষা দেবেন এমন যারা আছেন তারা ছোট খামের মধ্যে করে নিয়ে বের হন। ঢাকার বাইরে যারা তারা অবশ্যই টিকিট কেটে রাখেন বাসের জন্য হলে বাসের আর ট্রেনের জন্য হলে ট্রেনের টিকিট কেটে রাখেন। অনলাইন হওয়াতে অনেকেই অনলাইনেই টিকিট কেটে রাখেন। তবে আমি এমনও চাকরি প্রত্যাশাকারীকে দেখেছি যিনি ট্রেনের মাসিক টিকিট করে রেখেছেন যেহেতু প্রতি সপ্তাহেই তাকে আসতে হয় পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। 


(খ) কত টাকা খরচ হবে সেটার একটা পরিপূর্ণ হিসেব করা

বিষয়টা হয়তো শুনতে একটু কেমন দেখায় তবে যারা বেকার তারা এই বিষয়টা অনেক বেশি খেয়াল রাখে। চাকরিতে আবেদন করতে অনেক সময় দেখা যায় খরচ হয় ১২০ টাকা কিন্তু সেটার পরীক্ষা দিতে আসতে এবং যেতে খরচ হয় ২ হাজার টাকা। বেকার যারা তাদের কাছে এই টাকাগুলো প্রতি সপ্তাহে ম্যানেজ করে রাখাটাও একটা কাজের মধ্যেই পড়ে। অনেকেই আছে যারা ঢাকার মধ্যে তাদের ক্ষেত্রেও যে সমস্যা হয় না বিষয়টা তা নয় তারাও আগে থেকেেই পিপারেশান নিয়ে থাকেন। বেকারদের কাছে ১০০ টাকাও অনেক টাকা কারণ তাদের প্রত্যেকটা সময় কাটে হতাশার চাইতেও বড় একটা আতঙ্ক পরিবেশকে মানিয়ে নেওয়ার অভিনয় করতে। 



আমাদের দেশে মনে করা হয় পড়াশোনা শেষ করা হয়ে গেলেই মনে হয় চাকরি। আসলে গ্রামের মানুষরা এখনও সেই আগের মতই ধারণা নিয়ে রাখে এবং তারা মনে করে পড়াশোনা শেষ করা মানেই চাকরি করবে আসলে বাস্তবে বিষয়টা এমন নয়। একটা কথা আছে তা হলো, “দিন যত যেতে থাকে আমাদের লক্ষগুলোও আস্তে আস্তে কমতে থাকে।”  কথাটা ছোট হলেও এর গভীরতাটা অনেক বেশি। যাইহোক ঢাকার বাইরে যারা থাকেন তাদের জন্য টাকা অংকটা মেলানো অনেক কঠিন বা অনেক বড় একটা কাজ। অনেক বেকার ভাই বা বোন আছেন যারা বাবার কাছ থেকে টাকা ম্যানেজ করে রাখেন বেশির ভাগই অবশ্য নিজের সঞ্চয় করা টাকা থেকেই খরচ করেন। কারণ এই সকল বিষয়ে টাকা পরিবার দিতে হলে কিছু কথা শোনায় আর প্রতি সপ্তাহে টাকা চাওয়াটাও একটা লজ্জ্বার বিষয় হয়ে দাড়ায়। আত্মসম্মান বোধ থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরো জটিল হয়ে থাকে। 



(গ) পড়াশোনা করা 

উপরের দুইটা বিষয় অবশ্যই পড়াশোনার পাশাপাশিই করা হয়। যিনি যেই সেক্টরে পরীক্ষা দেবেন তিনি সেই সেক্টর সম্পর্কে যথেষ্ঠ পড়াশোনা করে রাখার চেষ্টা করেন। অনেক সময় সেই সকল সেক্টর সম্পর্কে কিছু জানতে চাওয়া হয়। আমি একজন ভাইকে দেখেছিলাম যার পরীক্ষা ছিল মাসের শুরুতেই আর তিনি প্রায় ৩ ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে ২০ টাকা দামের একটা মাসিক পরীক্ষা যেটার নাম “কারেন্ট অ্যাফোয়াস” যা কিনতে তার ৩০ টাকার রিক্সা ভাড়া ও ৩ ঘন্টা সময় ব্যয় হয়েছে। তিনি সেটা কিনেছেন কারণ সেখানে কিছু আপডেট তথ্য থাকে যদি সেখান থেকে কিছু প্রশ্ন কমন আসে। সেই আশায় তিনি সেটা কেনার জন্য এতটা সময় অপেক্ষা করেছেন। এসব করেন পড়াশোনা করার জন্য কারণ চাকরি প্রত্যাশা করেন যারা তারা অনেক বেশিই পড়াশোনায় অভ্যস্ত হয়ে থাকেন। 


যারা শহরে থাকেন তারা তো অনেকটা দেখা যায় বাইরেও কম বের হন কাজ ছাড়া এবং পুরো সময়টাই কাজে লাগান তার পড়াশোনার জন্য এবং খাওয়া, গোসল, ঘুম আর পড়াশোনা এটাই তাদের ডেইলি রুটিন যদিও পড়াশোনা যারা শেষ করেন তারাই বেশি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। জব সলুশান, মাসিক পত্রিকা থেকে শুরু করলে বিষয়ভিত্তিক বইগুলোও তারা কিনে থাকেন পড়াশোনা করার জন্য। অনেকেই বর্তমানে আবার বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও পড়াশোনা করে থাকেন। আমার জানা কয়েকটি অনলাইনে পড়াশোনা ও পরীক্ষা দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া যায় এমন সাইটের নাম নিচে দিচ্ছি। হয়তো আপনাদের ‍উপকার হলেও হতে পারে।


(১) Study Online BD = অনলাইন লিংক

উপরের সাইটের মাধ্যমে আপনি চাকরির জন্য আবেদন করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা ও প্রস্তুতি মূলক পরীক্ষাসহ সকল তথ্যই পাবেন। এখানে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এবং সবাই নিজে নিজে এখানে নিজের প্রস্তুতি নিতে পারবেন। 


(২Study Lights = অনলাইন লিংক

এই সাইটটিতে চাকরি সহ একাডেমিক সকল পড়াশোনা করা যাবে। 


(৩) Exam BD = অনলাইন লিংক

এখানে গ্রামার সহ পড়াশোনা ও চাকরি নিয়ে অনেক লিখা আছে যেখান থেকে আপনি পড়াশোনা করতে পারবেন আবার চাইলে কিছু পিডিএফ ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। 


(৪) লেখা পড়া বিডি = অনলাইন লিংক

এখানে পড়াশোনা নিয়ে যত তথ্য বা খবর আছে পাওয়া যাবে। 


(ঘ) শুক্রবারের সকাল

সকালে সাধারণত যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসেন তারা বাস বা ট্রেন থেকে নেমে একটু রেস্ট নিয়ে কোথাও থেকে ফ্রেশ হয়ে বা কোন হোটেলে গিয়ে নাস্তাটা শেরে ফেলেন। আবার যারা ঢাকার মধ্যে থাকেন তারা নামায পড়েন অনেকেই ফজরের তারপর সকালে আর ঘুমান না অন্য দিন হলে হয়তো সকাল ৯টা বা ১০টার দিকে ঘুম থেকে উঠেন কিন্তু এই ছুটির দিনটিতে তারা সকালেই উঠে রেডি হয়ে বের হয়ে পড়েন পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। অনেকেই যাওয়ার আগে এডমিট ও অন্যন্যা কাগজ মানে কলম বা ঠিকানা বা তথ্যগুলো এবং কিছু রিভিশান করার দরকার পড়লে সেটাও করে নেন। 


ঢাকার মধ্যে নিউমার্কেট ও ধামমন্ডি এলাকার কেন্দ্রগুলোতে ব্যগ নিয়ে ঢুকতে দেয় না সাধারণত। তবে এই এলাকা ছাড়া অন্যগুলোতে ব্যগ বা মোবাইল নিয়ে ঢুকতে দিলেও সেটা সামনে রাখতে হয়। ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজসহ আরও কিছু কলেজ বিশেষ করে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা সিটি কলেজেই বেশি দেখা যায় ব্যগ বা মোবাইল চেক করে করে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। আর কাউকে ব্যগ এসব নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন না। আসলে অনেকেই যারা দুর থেকে আসেন অথচ ঢাকা থাকার মত কোন জায়গা নেই তাদের সমস্যা হয়ে যায় তখন। বেশিরভাগ আসেন ঢাকার বাইরে থেকে তারা ছোট একটা ব্যগ বহন করেন এবং সাথে করেই আবার নিয়ে চলে যান এই টুকু সময়ের জন্য ব্যগটা সাথে করেই রাখেন তারা। 


আরও কিছু বিষয় থাকে যা বলার মত না বা বললেও হয়তো শেষ হবে না। অনেকেরই শুক্রবারের খাবারটা ঠিকমত হয় না কারণ ঢাকার মধ্যে খাবারের খরচটা তাদের কাছে অনেকটা বেশি মনে হয়। তবে আপনি যদি নতুন হন তবে কিছু বেশি টাকা খরচ করতে হয়তো চাইবেন কিন্তু পুরানো হলে বেশি টাকা খরচ করতে আগ্রহী হবেন না কারণ প্রতি শুক্রবারে আসতে আসতে আপনি অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। 

Leave a Comment